যেখানে তথ্য প্রবাহের ঘাটতি সেখানেই গুজবের সৃষ্টি

অনুজ ভূঞা ||

গুজব!গুজব!গুজব! রীতিমতো এটা শুনে আমরা তো বিরক্ত। গুজব কী?

তাহলে বলবো,গুজব হলো কোনো একটা মিথ্যা সংবাদ,যেখানে কোনো একটি সংবাদকে অতিরঞ্জিত করে সাজিয়ে কোনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে দেওয়া।আমাদের মধ্যে প্রায়শই শুনতে পাওয়া যায় গুজবে কান দিবেন না।সত্যিই কি আমরা গুজবে কান দেই না? বিশ্বায়নের এই যুগে গুজব বিষয়টি এক জনগোষ্ঠী থেকে অন্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। কোনটি গুজব আর কোনটি সত্য তা নিরূপণ করাই যেখানে আমাদের জন্য দুরূহ কাজ হয়ে দাঁড়ায় সেখানে গুজবের ডালপালা তো ছড়াবেই।গুজব কোনো একটা জনগোষ্ঠীর স্বার্থ হাসিলের বিষয় হতে পারে। আবার নাও হতে পারে।অনেক বেশি তথ্য- প্রমাণের ভিত্তিতে প্রমাণ করতে হয় সত্যিকারের সত্যিটা। যদিও এই সত্যির বিরুদ্ধেও থাকে অনেক যুক্তিনির্ভর তথ্য-উপাত্ত।যার ফলে আমরা পড়ে যাই সত্যিকারের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে।কোনো কোনো গুজব একই মত বা পথের মানুষ সহজেই আমলে নিবে,যদি তাদের মতের সাথে মিলে যায় তবে তারা একাত্মতা পোষণ করবে এবং তাদের সমমনার মানুষের মধ্যে সেটি দ্রুত ছড়িয়ে দিবে।আবার এমনও হতে পারে আরেকটা পক্ষ ছড়িয়ে দেওয়া গুজবকে তারা তাদের মতো করে যুক্তি,তথ্য উপস্থাপন করে নাকচ করে দিবে।

গুজবকে সমাজের একটা অংশ ধর্মের বাণীর মতো গিলে নেয়।পরবর্তীতে যখন সত্যিটা উদঘাটন হয় তখন তা গুজব হিসেবেই পরিচিত লাভ করে।গুজব একটু অন্য ধরনের রঙে-ঢঙে সাজানো থাকে যা সাধারণ মানুষকে অন্যান্য মনোযোগের জায়গা থেকে সরিয়ে এনে মনোনিবেশ করায় গুজবে।

সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে বিগত বছরগুলোতে গুজব বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।বড় ভাই গালিব হাসান,আমাকে এই বিষয়ে মোটামুটি আশ্বস্ত করেছে যে,গুজবটা আসলে বিরোধী দলের সৃষ্টি। গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে এবং সাধারণ জনগণকেও প্রভাবিত করার একটা প্রয়াস থাকে।কিন্তু সব গুজব কি বিরোধী দলের সৃষ্টি?এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য আমরা করোনা ভাইরাসকে কেন্দ্র যে বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থার উদ্ভব সেটিকে সামনে নিয়ে আসতেই পারি যেখানে রাজনৈতিক বিষয়টি একদমই অনুপস্থিত। তবে বিগত বছরগুলোতে ছড়ানো কোনো কোনো গুজবগুলোর সাথে সরাসরি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়।আর এই আলোচনা,গুজব বিরোধী দলের সৃষ্টি তা একদমই উড়িয়ে দিতে পারি না।
কিছু রাজনৈতিক গুজব-

পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে,
চাঁদে সাঈদীকে দেখা ইত্যাদি ইত্যাদি।
বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক গুজবকে কেন্দ্র করে আমরা বিভিন্ন সময় তৃতীয় একটা শক্তিকে সুযোগ নিতেও দেখেছি।

সবসময় কি এভাবে দায় সাড়া কথাবার্তা বলে পার পাওয়া যাবে?হয়তোবা এই অঞ্চলে পার পাওয়া যেতেও পারে। এতক্ষণ তো খুব করে বলেই গেলাম গুজব বিরোধী দলের সৃষ্টি। এবার আসি গুজব সৃষ্টিতে ক্ষমতাসীনদের কি ভূমিকা? চলুন ঘুরে আসি সেই প্রশ্নের উত্তরে। এই অঞ্চলে গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নেই বললেই চলে। আসলে যেখানে তথ্য প্রবাহের ঘাটতি থাকে সেখান থেকেই তো গুজবের সৃষ্টি। আমাদের মূলধারার গণমাধ্যমগুলো সেলফ সেন্সরশীপ থেকে ঐভাবে বেরোতে পারে না।এরই অংশ হিসেবে রয়েছে তাদের উপর আরোপিত বিভিন্ন ধরনের কালো আইন। সাংবাদিকদের মধ্যে সবসময় একটা চাপা আতঙ্ক বিরাজ করে। এর ফলে তারা সবসময় সত্য ও নিরপেক্ষ সংবাদ প্রচার করতে পারে না বরং সরকারের প্রতি তাদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করতে হয়। ফলশ্রুতিতে সরকারের প্রতি জনগণের একটা আস্থাহীনতার জায়গা তৈরী হয়। যখন সাধারণ মানুষের এই ধরনের গণমাধ্যমের প্রতি বিশ্বাস উঠে যায়, বাধ্য হয়ে মানুষ বিভিন্ন ধরনের ভুয়া অনলাইন নিউজ পোর্টাল,আইডি ও ইউটিউব চ্যানেলের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।আর এখান থেকেই মূলত গুজবের আবির্ভাব।যদি একবাক্যে বলি তাহলে বলবো অদৃশ্য কোনো জায়গা থেকেই গুজবের সৃষ্টি।সমাজের একটা অংশ হয়তো ভাবতে পারে এর ভিত্তি আছে কিন্ত প্রকৃতঅর্থেই এর কোনো ভিত্তি নাই।

সমাজের বুদ্ধিজীবী বা সম্মানিত ব্যক্তিরা যখন এই গুজবের দ্বারস্থ হয় তখন সেটা আরো বেশি ছড়িয়ে পড়ে।বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় গুজবের ডালপালা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ বাংলাদেশে এখনো সঠিক তথ্য পাওয়ার যে সঠিক উৎস রয়েছে তা নিয়েই রয়েছে গণমানুষের নানান প্রশ্ন ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব।জনমনের নানা প্রশ্ন, দ্বিধাদ্বন্দ্বকে পাশ ঠেলে স্বাধীন নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সক্ষমতারও যথেষ্ট অভাব রয়েছে এই উৎসগুলোর।এই জায়গা থেকে যখন বাংলাদেশ বেরিয়ে আসবে তখন হয়তো গুজবকে সত্যে পরিণত দিনক্ষণ ঠিক করতে হবে না। বাংলাদেশের অনেক মানুষ ইন্টারনেটের ব্যবহার এখনো বোধহয় ঐভাবে শিখতে পারে নি।একজন আরেকজনের নামে ভুয়া আইডি খুলে গুজব বা মিথ্যা খবর ছড়িয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করে না।নাসিরনগরের কথাই বলি না কেন..সেখানে দেখেছি ভিকটিমের নামে ভুয়া আইডি খুলে গুজব ছড়ানো হয়।

কতটুকু অসুস্থ মানসিকতার মানুষ হলে আমরা বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়িয়ে সমাজকে অস্থিতিশীল করে তুলি। অশিক্ষিত মানুষের পাশাপাশি যখন শিক্ষিত মানুষেরা এই গুজবকে নিয়ে মাতামাতি করে তখন গুজবটা ছড়াতে আর কোনো প্রভাবকের দরকার হয় না।
কোনো একটা তথ্য বা ঘটনা যখন সমাজের অন্যান্য ঘটনার চেয়ে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে সাজানো থাকে তখন সমাজের মানুষ সেটাকে সত্য-মিথ্যা না ভেবেই লুফে নেয়।এক্ষেত্রে তাদের কোনো যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন হয় না।এইটা যে একটা ব্যতিক্রম ঘটনা সেটাই তাদের কাছে ঘটনাটা সত্য হওয়ার অন্যতম মাপকাটি।যখন সমাজের একটা অংশ এই সংবাদ বা ঘটনাকে বিশ্বাস করে তখন মনে হয় যেন পুরো সমাজের কাছে এই বার্তাটি পৌছে দেওয়া তাদের অন্যতম দায়িত্ব হয়ে পড়ে।

অনেকক্ষণ যাবত গুজবের উৎপত্তি, গুজবের নেতিবাচক প্রভাব আলোচনা করেই যাচ্ছি। কিন্ত গুজবকে যে ইতিবাচক ধারাতেও ব্যবহার করা যায় সেটা কি আমরা জানি?সেই বিষয়টাই না হয় একটু আলোচনা করি-
বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘গুজব’একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।মুক্তিযুদ্ধে গুজব ছড়িয়ে হানাদার বাহিনীদের অনেকটা কোণঠাসা করা হয়।টিক্কা খান মেরে ফেলার মতো গুজবও সেদিন খুব করে প্রচার করা হয়।এর ফলে মুক্তিবাহিনীর মনোবলও বেড়ে যায়।তাছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীর কাল্পনিক বীরত্বের কথাও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ও ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত হতে থাকে। এর ফলে বিজয় অনেকটা ত্বরান্বিত হয়।

সেদিনও দেখেছি ছেলেধরা গুজবে বাবা- মায়েরা তাদের সন্তানদের ঘর থেকে বের হতে বিধিনিষেধ আরোপ করে।আজকের এইদিনেও যদি এই ধরনের গুজবে মানুষকে ঘরে রাখার ব্যবস্থা করা হতো,দেশটা হয়তো করোনার থাবা হতে অনেকাংশে মুক্তি পেতো।গুজবের ইতিবাচক দিকটি আরো বেশি মূর্তমান হয়ে উঠতো।

বাংলাদেশে মিথ্যা বা গুজবের হরহামেশাই ব্যবহার হচ্ছে। এতে যেমন দেশের মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের মৃত্যু ঘটে সেই সাথে দেশকে এক ধাপ পিছিয়ে দিতেও সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করে।

কথাগুলো এভাবেই শেষ করতে চাই, যদি নৈতিক মানদণ্ডের প্রশ্ন তোলা হয় তাহলে বলবো বাংলাদেশের মানুষ নৈতিক মানদণ্ডে অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে।বাংলাদেশের মানুষ যেমন নৈতিক মূল্যবোধের বির্সজন দিতে জানে সেই সাথে অর্জন করতেও কালক্ষেপণ করে না।প্রত্যাশা করবো,গুজব নেতিবাচক প্রবাহমান ধারা হতে ফিরে আসুক।আর সেটা সফল করতে বিভিন্ন দল,মতের মানুষ ছাড়াও সরকার এগিয়ে আসুক।আমি তো প্রতিনিয়তই একটি সুস্থ,সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি।গুজব বিনাশের মাধ্যমেই না হয় সেই স্বপ্নের প্রথম বাস্তবায়ন ঘটুক।

Share
  •  
  •  

Leave a Reply