ভাইরাল বাংলাদেশ

অনুজ ভূঞা ||

অতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের আপামর জনতা ভাইরাল বিষয়টির সাথে পরিচিত।আসলে ভাইরালের কোনো শাব্দিক অর্থ নেই।ভাইরালের কল্যাণে কেউবা অতি সম্মানের আসনে আবিষ্কৃত হয়,আবার কেউবা নিজের অবস্থান থেকেও আরো নিচে নেমে আসে। ভাইরাল পথের মানুষকে যেমন প্রাসাদের মানুষে পরিণত করে তেমনি কাউকে খলনায়কে পরিণত করতেও খুব বেশি সময় নেয় না। ভাইরাল বিষয়টা যে শুধু বর্তমানে প্রচলিত তা নয়,পূর্বেও ভাইরাল হত তবে তফাৎ শুধু বর্তমানে কোনো একটা বিষয় খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আর অতীতে সেটা হতো খুব ধীরে ধীরে।কোনো একটি লেখা বা ঘটনা যখন আমাদের নিজের সাথে মিলে যায় তখন আমরা সেটি খুব বেশি শেয়ার করি।

“ভাইরাল”বিষয়টি গত এক বছর আমি খুব মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ করি তাতে গিয়ে যা পাই,এটার স্থায়িত্বকাল হচ্ছে অতি অল্প সময়।একেকটা ভাইরাল বিষয় আরেকটা ভাইরাল বিষয়কে সরাতে উঠে পড়ে লাগে।বলে রাখি কোনো একটা বিষয় ভাইরাল হতে কিছুটা সময় নেয় আর এই সময়ে উক্ত বিষয়টি ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট মিডিয়া বা অন্য কোথাও অনেক বেশি আলোচিত-সমালোচিতহয়,মুহূর্তেই অন্যান্য আগ্রহের জায়গা থেকে বিচ্ছুতি ঘটিয়ে আপনাকে ভাসিয়ে দিবে ভাইরালের অবগাহনে।ভাইরাল বিষয়গুলোতে আপনার খুব অাগ্রহ জন্মাবে।

বাংলাদেশেরও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাইরাল বিষয় মাতিয়ে রেখেছে। ভাইরালের স্রোতে আমরাও নিজেদের গা ভাসিয়ে সভ্য নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে দেখেছি।কিন্তু সেই পরিচয়টা ছিলো যে ক্ষণস্থায়ী সেইটা আমরা খেয়াল করি নাই।ভাইরালকে বিভিন্ন সময় আমরা ব্যবহার করেছি বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে, কখনোবা সতর্কতা হিসেবে, আবার কখনোবা ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বার্থে কারণ আমি আগেই বলেছি আমরা হচ্ছি সভ্য নাগরিক।ভাইরাল বিষয়গুলি বুঝি এই সভ্য নাগরিকের দ্বারাই হয়?আমি জানি না, জানতেও চাই না।কারণ আমি একটা অসভ্য নাগরিক।সভ্যের খেলায় অসভ্যের কথা বলাই যে মানা।

আসলে কোনটা সভ্য আর কোনটা অসভ্য সেটা নিয়েই তো আমাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। যাই হোক আমি সাহিত্যের কথাবার্তা অত বুঝি না।ভাইরাল কি কোনো একটা গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে ফাঁসানো,অথবা আরেকটা গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে বাঁচানো?তা আমি জানতে চাই। আমরা কি কখনো নিজেদের ভাইরালের নোংরা জলে ভাসতে দেখে খুশি হই?না শুধু অপরের বেলায়ই খুশি হই তা আমি আরো জানতে চাই।আমরা এমন কেন? দুই একটা কাজ দিয়েই কাউকে বিচার -বিশ্লেষণ করে নিতে দ্বিধাবোধ করি না।

আমি যেখানে ভুল করতে পারি, তুমি কেন নয়?তবে আরেকটা বিষয় এখানে বিবেচ্য, ভাইরালের মাধ্যমে অনেক ইতিবাচক ফলও লাভ করা গেছে ইতোমধ্যে। তাই তো সভ্য নাগরিকের অন্যতম একটা হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এই ভাইরাল।মানুষ হিসেবে যে আমাদের ভুল করার অধিকার রয়েছে সেখানে শুধরানোর জায়গাটা কেন নয়।বরং আমরা নিজেরাই করি নিজেদের বিচার,করি তুলোধোনা। তারপর তো আর শুধরানোর জায়গাটা থাকল না।জানি আপনি বলবেন, আমি সুশীল দেশের সুশীল নাগরিক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার আমার রয়েছে।আপনি কি সবসময় এই সুশীল জায়গাটাই থাকেন? না, আপনি থাকেন না।আপনি কি সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেন,অবশ্যই বলেন না।তাহলে আমি বলবো আপনি শুধু ভাইরাল বিষয় সম্পর্কে সচেতন।একটা সমাজে কি শুধু তুলোধোনা অশ্লীল, অশ্রাব গালি ও কথাবার্তার মাধ্যমেই সব অন্যায়, অনিয়ম দূর করা যায়?যদি যায় তবে ভাইরালই হোক সভ্য নাগরিকের হাতিয়ার।আমি সাদরে গ্রহণ করবো এই হাতিয়ার।

ভাইরালের সময়ে আমি সমাজের মূখ্য বা আলোচ্য বিষয়গুলোকে ফেলে নিজেকে সময় দিবো গৌণ বিষয়গুলোতে।হতে পারে আপনার, আমার কাছে এই ভাইরাল বিষয়টাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ। হতে পারে দেশের, দশের কাছে অনেক কল্যাণকামী। যদি এই ভাইরাল বিষয়টাই আমাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয় তবে কেন মুহূর্তেই অপর একটি ভাইরাল বিষয়ের আগমনে পুরোনো ভাইরাল বিষয়টা ভুলে যাই? আমি জানতে চাই,খুব করে জানতে চাই।আপনি সভ্য,তাই আমার প্রশ্ন করাও মানা।কারণ আমি অসভ্য। ভাইরালের জগতে তুমি, আমি যে অসভ্য নাগরিকের চেয়ারটা দখল করছি সেই বিষয়ে একদমই নজর নাই।বর্তমানে ভাইরাল এক শ্রেণির মানুষের বিনোদনের খোরাক বললেও বেশি কিছু ভুল বলা হবে না।

অনেক সময় আমরা দেখেছি,সমাজের এই ভাইরাল বিষয়গুলোকে নিয়ে সমাজের জ্ঞানী-গুণী বা বুদ্ধিজীবীরা লিখেন বা কথা বলেন।তারা তাদের মতো করে ব্যাখ্যা, বর্ণনা দিয়ে এই ভাইরাল বিষয়কে উপস্থাপন করে সমাজের এক শ্রেণির মানুষকে প্রভাবিত করেন।তারা জ্ঞানী-গুণী হওয়ার ফলে ঐ শ্রেণী নির্দ্বিধায় তাদের কথাগুলো সহজেই মেনে নেয়।কিন্তু তারাও যে ভুল করতে পারে সে বিষয়টি একবারও আমরা মাথায় নিয়ে আসি না। আমরাও এমনভাবে বুঝতে সক্ষম যে, তারা কখনোও ভুল করতে পারে না।আর এই বিষয়টা থেকেও কোনো একটি বিষয় সহজেই আরো বেশি ভাইরাল হতে পারে।ভাইরাল অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের যেমন অবতারণা করে তেমনি ইতিবাচক বিষয়কেও তুলে ধরে।আবার বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় শব্দ ভাইরাল জগতে প্রবেশ করে ভবিষ্যত প্রজন্মকে বিপদগামী করে তুলছে এবং অবলীলায় সেই শব্দগুলো সমাজের নীরব সমর্থনের মাধ্যমে সমাজে জায়গা করে নিচ্ছে।এর ফলে বাঙালির সুস্থ সংস্কৃতির ধারা ব্যাহত হচ্ছে।আমরা শুনেছি “মদ খাঁ”,রোদ্দুর রায়ের রবীন্দ্রনাথের একটি গানকে বিকৃতি করা অপ্রাসঙ্গিক কিছু শব্দ যা কি না আমরা স্কুল, কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ের আড্ডাগুলোতে হরহামেশাই ব্যবহার করছি যা সহজেই আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে একটা সংকটের মধ্যে দাঁড় করিয়ে দেয়।

পরিশেষে আলোচনা আমাকে এই দিকে ইঙ্গিত করে যে, অপ্রাসঙ্গিক বা কাউকে হেনস্তা করার সংস্কৃতি থেকে যত বেশি বেরিয়ে আসার চেষ্টা করবো, অপরকে যত বেশি শুধরানোর সুযোগ করে দিবো, যত বেশি ভাইরাল বিষয়গুলোর বৈপরীত্য খোঁজার চেষ্টা করবো ততোই সমাজের জন্য মঙ্গলজনক।সর্বোপরি আমরা সবাই তো সমাজেরই মানুষ। ভালো-মন্দ,ভুল-ত্রুটির উর্ধ্বে থেকে মানুষ মেনে নেওয়ার মধ্যেই তো আমাদের সার্থকতা।

Share
  •  
  •  

Leave a Reply