আমার রাজেশ্বরী ও আমার ছেলেবেলা

মনিরুজ্জামান রাফি ||

নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম জফরপুর। পাশ দিয়েই বয়ে গেছে রাজেশ্বরী নদী। এই গ্রাম আর নদীর তীরেই হেসে খেলে কেটেছে আমার শৈশব। আমার এই গ্রামটি অনেক প্রাচীন। এই গ্রামের জাফরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১৮ সালে। এখানেই পড়ালেখায় হাতেখড়ি আমার।

এখানকার মাঠে ঘাটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমার অনেক স্মৃতি। এই গ্রাম আমাকে দিয়েছে শৈশবের সেই সেরা মূহুর্তগুলো। যা ভুলবার কোন ক্ষমতা আমার নেই। এখনো শৈশবের স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে বারবার মন চাইছে আবার নতুন করে শৈশবটা শুরু করতে। জানি সময়ের গভীর অতলে তলিয়ে যাওয়া দিনগুলোতে ফিরে যাওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। এখন যা শুধু কল্পনাতেই সম্ভব।

এখনো মনে পড়ে ১৮.৩৩ একর জমির উপর অবস্থিত “খোজার দিঘীর” কথা, দিঘীটির সুবিশাল পাড়ে, নির্জনতাকে সঙ্গী করে দাড়িয়ে আছে অসংখ্য আমগাছ, বৈশাখে খুব ভোরের আমতলা যেন নিজের ঘরের প্রতিটি কোনার মতো পুরোপুরি চেনা, ঝড়ো বেগে একটু হাওয়াতেই আমে বিছিয়ে থাকতো পুরো আমতলা। আমরা দু’চারজন চাচাতো ভাই মিলেও সেই আম কুড়িয়ে শেষ করা যেতো না, আরেকটি মজার বিষয় হল আম গাছের তলায় যে সবার আগে পৌছাতো , তার কপালেই জুটতো সবচেয়ে বেশী আম। তাই ভোর হতে না হতেই আবছা অন্ধকারে একা একাই টর্চলাইট নিয়ে বেড়িয়ে পড়তাম আম কুড়ানোর উদ্যেশ্যে। আর মাঝে মাঝে আমার সঙ্গী হতো আমার বৃদ্ধ দাদী যিনি আমার সকল আবদার পূরণে অতুলনীয় অবদান রাখতেন।

আজ সেই খোজার দিঘীর বুকে তার গভীরতা হারানোর কষ্ট চেপে আছে। সেই খোজার দিঘীর কথা এখন আর কেউ ভাবে না। সেই খোজার দিঘী সংরক্ষণের কথা কেউ ভাবে না, সেই খোজার দিঘীর ইতিহাস নিয়ে কেউ দু চার লাইন লিখেও না। দিঘীটি এখন শুধুই অবহেলিত।

আর রাজেশ্বরী র কথা না বললেই নয়, পাল তোলা সারি সারি নৌকা নিয়ে জেলেরা ভাসতো নদীর জলে। বর্ষার শুরুতে ধীরে ধীরে রাজেশ্বরীর পানি বাড়তে শুরু হতো , ঠিক এই সময়টাতে রাজেশ্বরীর দু পাড়ের জমিগুলোতে নতুন পানি এলে অসংখ্য ছোট ছোট মাছ দৌড়ঝাঁপ করতো আর এই সুযোগ আমিও ছোট জাল নিয়ে নেমে পড়তাম অস্বচ্ছ জলে। মাছ ধরতে না পারলেও মাছ ধরার আনন্দটা উপভোগ করাই ছিল তখন মূল বিষয়। আর অন্যদিকে মাছ না নিয়ে বাড়ি ফিরলেই মা আহ্লাদি ছেলেকে বলতেন “আজ মাছ না নিয়ে ঘরে প্রবেশ করা নিষেধ”। আমি মায়ের কথায় উপযুক্ত কোন জবাব না দিয়েই চুপচাপ ঘরে প্রবেশ করতাম। আর ঘরে এলেই শুরু হতো ঘরে কি আছে তা খুজে বের করা, তখন মনে হতো এটাই আমার তখনকার দায়িত্ব।

শুকনো মৌসুমে রাজেশ্বরীর পানি প্রায় শুকিয়ে নদীর তলায় চলে যেত, তখন কয়েকজন মিলে নদীর মাঝখানে ছোট ছোট খানাখন্দ তৈরী করে তা সেচে মাছ আহরণ করাতেও ছিল অন্যরকম মজা। ছোট জাল পেতে শুরু হতো মাছ ধরা, আর তখন সারা গায়ে কাঁদা না মাখালে মাছ ধরার আনন্দটা “ভাত খেয়ে পানি না খাওয়ার মতোই অপূর্ণ থেকে যেত”। তবে মাঝে মাঝেই বাবা এসে সেই মজাটা মাটি করেছেন।

আবার কখনো বা রাজেশ্বরীর এঁটেল মাটি দিয়ে তৈরি করেছি মাটির হাড়ি-পাতিল, পুতুল,চুলা ইত্যাদি। কখনো কখনো সেই মাটি বাড়িতে এনে মা ও চাচিকে এনে দিতাম রান্নার জন্য চুলা বানাতে।

গাঁয়ের অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই। সেই রাজেশ্বরী তার রাজত্ব হারাতে বসেছে। শীর্ণ রূপ দেখে মাঝে মাঝে নিজেই চমকে উঠি। একি! এক সময় যে নদীতে পাল তোলা নৌকা ছুটত, যে নদী পথ গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগে কাজে লাগত তার আজ কি দশা! লাবণ্য হারিয়ে দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে ও গভীরতায় ক্ষীণ হয়ে এসেছে। তবুও সে আমার রাজেশ্বরী! কেউ আমার রাজেশ্বরীর পাশে না থাকলেও আমি সবসময়ই রাজেশ্বরীর পাশে থাকবো। আমার রাজেশ্বরী যেন রাজত্বহারা না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখবো।

Share
  •  
  •  

Leave a Reply