বাহন

কাশফিয়া আঁখি ||

দুপুর সোয়া একটা। রিকশাটা থামিয়ে উঠানের এক কোনে রেখে বাজারের ব্যাগটা ধপ করে রাখলো মজিদ। মজিদকে আসতে দেখে রান্না ঘর থেকে তাড়াতাড়ি  বের হয় তার ৫মাসের অন্তঃসত্তা স্ত্রী হোসনা।

কলপাড়ে হাতমুখ ধুইতে ধুইতে মজিদ চেঁচিয়ে বলে, ঐ খাওন রেডি কর। হোসনা বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে ভাতের থালায় ভাত বাড়তে থাকে। মজিদ খেতে বসে তরকারির বাটিতে তাকিয়ে দেখে আলু ভর্তা আর একবাটি ডাল।

-কি রে আর কিছু রান্দস নাই?

-না ঘরে তো কোন মাছ তরকারি নাই আইজ তিনদিন।আপনেরে তো রোজই কইতাসি । আপনে তো কন টেকা নাই।

-টেকা না থাকলে কি বানামু নি বলেই খাবার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মজিদ।

-হোসনা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে,ভাত কয়ডা খাইয়া যান দোহাই লাগে।

মজিদ ত্রোধে ভাতের থালা, তরকারির বাটি লাথি মেরে হনহন তরে হেঁটে বাড়ির বাইরে চলে যায়। এলাকার সবাই জানে মজিদ এখন  কোথায় যাবে। সে তো রোজকার রুটিন। সকালে রিকশাটা নিয়ে বেড়িয়ে দুপুরে বাড়ি ফিরে মজিদ। দুপুরের খাবারের পর মাঝরাত অবধি সে গাঁজার আসরের মধ্যমণি হয়ে থাকে। গাঁজার সাথে রাতভর চলে জুয়া। রিকশা চালিয়ে উপার্যনের প্রায় সব টাকা সে ব্যয় করে জুয়াতে। চোখের জল মুছে হোসনা ছড়ানো বাসন গুছাতে থাকে আর মরা মাকে দোষারোপ করদে থাকে।

-মাগো, তুমি মইরা তো বাঁচছো আমার জীবনডা তো ত্যাজপাতা।

হোসনার আট বছর বয়সের সময় হোসনার মারা গেলে বাবা মাস দুইয়ের মাঝে নতুন মা ঘরে আনে। নতুন মায়ের সংসারে রোজ রোজ নানান অত্যাচারে অতিষ্ঠ হোসনাকে তার বাবা গাঁজাখোর মজিদের সাথে  তাকে বিয়ে দেন মাত্র তের বছর বয়সে। তারপর এক দুই বার বাবা খবর নিতে আসছে। তা ও আজ প্রায় বছর দুয়েক হলো। গাঁজাখোর স্বামীর হাতে প্রায়দিনই মার খেতে হয় হোসনা কে। তবুও নিরবে সে মেনে নেয় বুকে আশা বেঁধে সংসারে একটা সন্তান এলে কুঝি তার মায়ায় পরে সব ভুলবে স্বামী। আজ গর্ভের সন্তানেরর পাঁচ মাস বয়স কিন্তু কোন মানসিক পরিবর্তন হয়নি মজিদ। রোজ কোন না কোন বাহানায় সে বেধক মার মারে হোসনাকে।আজ পর্যন্ত একদিন ডাক্তারের কাছে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি মজিদ। তবুও হোসনা বেঁচে থাকবার স্বপ্ন আঁকে তার কোল জুড়ে একটা ছেলে আসবে। সে ছেলে তার সকল দুঃখ ঘুচিয়ে দেবে।

 

৩মাস পর,

সেদিন হোসনার শরীরটা বেশ ভালো নেই। জ্বরে সারা গা পুড়ে যাচ্ছে। দুপুরে যখন মজিদ জুয়ার আসরে যাচ্ছিল হোসনা ডেকে কললো। আমার জন্য দুইডা জ্বরের ঔষুধ আইননেন। জ্বরের তোপে আমি তো ঠিকমত দাঁড়াই তে পারতাছিনা। হাত পা ও ফুইলা গেসে। মজিদ বললো দেহি,রাড়িতে ফিরনের কালে আনমু।তারপর বেড়িয়ে গেল। সারাটা দুপুর সন্ধ্যা জ্বরের তোপে বেহুশ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে হোসনা। জ্বরের ঘোরে দেখে তার মা পাশে বসে চুল নেড়ে নেড়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে আর বলছে,,,আমার সোনা মা আমার কোলে ঘুমাও শান্তিতে। বহুদিন পর মায়ের স্পর্শ পেয়ে  হাউমাউ করে কেঁদে উঠে হোসনা। এভাবে কতক্ষণ স্বপ্নে বিভোর ছিল মনে নেই হোসনার। কপাটের খটখট শব্দে সম্বিত ফিরে পেয়ে সারাঘরময় মাকে খুঁজে একমহূর্ত।

 

-ওপাশে মজিদ চিৎকার করে বলছে মরার ঘুম ঘুমাইছস নি।

ধরফর করে উঠে দরজা খুলে কাঁপতে থাকে হোসনা। ঘরে ঢুকে মজিদ তেড়ে আসে কি রে  কি করতেছিলি। দরজা খুলতে এত দেরি করলি কেন? দরজা লাগিয়ে বিছানায় উঠতে উঠতে হোসনা বলে

-জ্বরের ঘোরে বেহুশের মতো হয়ে ছিলাম টের পাইনাই।

মজিদ কোন প্রতিউত্তর করে না। পাশ ফিরে শুয়ে পড়ে। ভয় কাতুরে কন্ঠে  হহোসনা মজিদকে বলে,

-আমার ওষুধ আনছেন?

কথাটা শেষ হবার সাথে সাথে মজিদ বিছানা ছেড়ে একলাফে উঠে বলে

-দাড়া তরে  ওষুধ দিতাছি।

 

দরজার ডাসা হাতে নিয়া এলোপাথারি পিটাতে থাকে। সাথে চড়, লাথি আছে ই। শেষমেশ এক লাথিতে চৌকি থেকে নিচে পড়ে জ্ঞান হারায় হোসনা। ফজরের আযান পড়ছে তখন । পাশের বাড়ির লোকজন মিলে একটা ভ্যানে করে শুইয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে হোসনাকে।

সকাল ৯টা।

সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে দুই জমজ ছেলে সন্তানের মা হয় হোসনা। কিন্তু সন্তানের মুখ দেখবার সৌভাগ্য হয়নি তার। সন্তান জন্মের পরপরই  জীবনের নতুন পথের যাত্রী হয় হোসনা। হোসনার বাবা এবার তাকে বাড়ি নিতে এসেছে চিরজনমের বাড়ি। সাঁঝের আগেই কবর দেয়া হয় হোসনাকে তার মায়ের কবরের পাশে কিন্তু মাগরিবের পর খবর আসে তার একটি সন্তান মারা গেছে। পরদিন দুপুরে দুটি সদ্যজাত সন্তানের লাশ আসে বাড়িতে। কেননা হোসনার ছেলেরা মায়ের মতো খুল করেনি। তারাও মায়ের পিছু নিয়েছে আজন্মকাল মায়ের বুকে থাকবার লোভে।

Share
  •  
  •  

Leave a Reply